ভূমিকম্প কাকে বলে? ভূমিকম্পের কারণ ও ফলাফল গুলি আলোচনা করো। Earthquake Causes and it’s effect

ভূমিকম্পের সংজ্ঞা(Earthquake):

কোনো প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম কারণে সংঘটিত ভু – আলোড়ন তরঙ্গ সৃষ্টির মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠ কে যখন ক্ষণিকের জন্য কম্পিত করে, তাকেই ভূমিকম্প বলে।

ভূমিকম্প সৃষ্টির কারণগুলি হল(Causes of Earthquake):

প্রাকৃতিক কারণ:

১) ভূত্বকীয় পাতের সঞ্চালন:

পৃথিবীর ভূত্বক যে বড়ো সাতটি ও ছোট কুড়িটি পাত নিয়ে গঠিত সেগুলির বিভিন্ন দিকে সঞ্চালন ই ভূমিকম্পের প্রধান কারণ। পৃথিবীর ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলগুলির সীমান্তে অবস্থিত।

Earthquake

২) নবীন ভঙ্গিল পর্বতের উত্থান:

গিরিজনি আলোড়নের প্রভাবে প্রবল পার্শ্বচাপে নবীন ভঙ্গিল পর্বতের উত্থান ঘটে চলেছে এবং এর জন্য শিলা চ্যুতি ঘটে থাকে, যা ঐ অঞ্চলে ভূমিকম্প সৃষ্টির কারণ।

৩) অগ্ন্যুদগম:

আগ্নেয় গিরি থেকে অগ্ন্যুদগমের সময় প্রচন্ড বিস্ফোরণ ঘটে এবং প্রচুর গ্যাস ও লাভার নিঃসরণের জন্য ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।

৪) পৃথিবীর সংকোচন:

পৃথিবী তাপ বিকিরণের মাধ্যমে ক্রমশ শীতল ও সংকুচিত হচ্ছে। ফলে ভূত্বকের শিলা স্তরে টান ও পীড় নের সৃষ্টি হয়। এজন্য পৃথিবীর দুর্বল অংশে ফাটল দেখা দেয় যা ভূমিকম্প সৃষ্টির অন্যতম কারণ।

৫) ধস ও হিমানী সম্প্র পাত:

পার্বত্য অঞ্চলে ধস নামলে ও হিমানি সম্প্র পাত হলেও ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।

৬) উল্কাপাত:

বৃহদাকৃতির উল্কাপিণ্ড ভূপৃষ্ঠে সজোরে আছড়ে পড়লে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হতে পারে।

কৃত্রিম কারণ:

১) পারমাণবিক বিস্ফোরণ:

পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য ভূগর্ভে শক্তিশালী পারমাণবিক বোমা ফাটালে পার্শ্ববর্তি অঞ্চলে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হ য়ে থাকে।
যেমন – ১৯৭৪ এবং ১৯৯৮ সালে রাজস্থানের পোখ- রানে ভূগর্ভে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের জন্য সংলগ্ন স্থানসমূহ ভূমিকম্প হয়।

২) খনিগর্ভের ভাঙন:

খনিজ সম্পদ সংগ্রহের জন্য খনন কার্যের ফলে অনেক সময় ভূগর্ভে বড়ো বড়ো সুড়ঙ্গ বা গহর সৃষ্টি হয়। কখনো কখনো দুর্ঘটনাবশত ওই সুড়ঙ্গের ছাদ সজোরে ধসে পড়ে। তখন সেই হটাৎ সৃষ্ট আঘাতের ফলে আশেপাশের স্থানে ভূমিকম্প হয়।
যেমন – ঝরিয়া ও রানীগঞ্জ অঞ্চলে একারণে মাঝে মধ্যে ভূমিকম্প হয়।

৩) জলাধার নির্মাণ:

অনেক স্থানেই নদীর গতি পথে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে বিশাল আকারের জলাধার নির্মাণ করা হয়।কোনো কোনো সময় ওপরের জলরাশির চাপে নীচের শিলাস্তর এর স্থানচ্যুতি ঘটে। এর ফলে ওখানে ভূমিকম্প হয়।
যেমন – ১৯৬৭ সালে কয়না জলাধারের প্রবল চাপের জন্য মহারাষ্ট্রের কয়না নগরে ভূমিকম্প হয়েছি ল।

৪) পার্বত্য অঞ্চলে রাস্তাঘাট নির্মাণ:

দুর্বল পার্বত্য ঢালে নিয়ম না মেনে রাস্তাঘাট নির্মাণ করলে শিলা স্তরে ভাঙন ও ধসের ফলে ভূমিকম্প সংঘটিত হতে পারে।

৫) ডিনামাইটের বিস্ফোরণ:

খনিজ দ্রব্যের অনুসন্ধান বা পার্বত্য অঞ্চলে রাস্তাঘাট নির্মাণের জন্য ডিনামাইটের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এর ফলে ও নিকটবর্তী স্থানসমূহে মৃদু ভূমিকম্প হয়।

৬) অন্যান্য কারণ:

রেলগাড়ি, বড়ো বড়ো ট্রাক প্রভৃতি চলাচলের সময় ভূমিতে মৃদু কম্পন হয়।

 

ভূমিকম্পের ফলাফলগুলি হল(Effect of Earthquake):

১) ধস নামা:

ভূমিকম্পের একটি উল্লেখযোগ্য ফল হল পার্বত্য অঞ্চলে ধস নামা।
যেমন – ১৮৯৭ সালে অসমে যে প্রবল ভূমিকম্প হয় , তার ফলে পাহাড়ি অঞ্চলে অসংখ্য ধস নামে, প্রচুর ঘর বাড়ি ধ্বংস হয় এবং জীবন ও সম্পতির হানি ঘটে।

২) চ্যুতির সৃষ্টি:

ভূমিকম্পের ফলে শিলা স্তরে যেমন চ্যুতির সৃষ্টি হয়, তেমনই অনেক সময় শিলা স্তর ওপরে উঠে পড়ে বা পাশে সরে যায়।
যেমন – ১৯০৬ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকো ভূমিকম্পে সান আন্দ্রিয়াস চ্যুতিরেখা বরাবর ভূমি অনুভূমিক ভাবে 2.5 থেকে 6 মিটার পর্যন্ত সরে গিয়েছিল। ১৮৯৭ সালে অসমের ভূমিকম্পে বিরাট এলাকা জুড়ে চ্যুতির সৃষ্টি হয়েছিলো।

৩) সমুদ্রতলের উত্থান বা অবনমন:

ভূমিকম্পের ফলে সমুদ্রতলের কিছু অংশ ওপরে উঠে যেতে পারে বা নীচে বসে যেতে পারে।
যেমন – ১৮৮১ সালে আন্দামান সংলগ্ন সাগরতলে প্রবল ভূমিকম্পের ফলে সমুদ্রতলের উত্থান ঘটে।

৪) নদীর গতি পথের পরিবর্তন:

ভূমিকম্পের ফলে পার্বত্য অঞ্চলে ধস নামলে তা নদীর গতি পথে এমনভাবে বাঁধের আকারে সঞ্চিত হয় যে নদী নতুন পথে চলতে বাধ্য হয়।
যেমন – ১৮৯৭ সালের অসম ভূমিকম্পে পাগলাদিয়া নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে নয়া বস্তির উত্তরে সরে যায়।

৫) নদীর গতিপথে হ্রদ সৃষ্টি:

ভূমিকম্পের ফলে পার্বত্য অঞ্চলে ধস নামলে নদীর গতিপথ অবরুদ্ধ হয়ে সাময়িক হ্রদের সৃষ্টি হতে পারে।
যেমন – ১৯৫০ সালে অসমে যে প্রবল ভূমিকম্প হয়, তার ফলে ব্রহ্মপুত্রের উপনদী সুবন্সিরি, ডিহাং এবং অন্যান্য কয়েকটি উপনদীর গতিপথের ওপর ধস নামার ফলে সাময়িক হ্রদের সৃষ্টি হয়।

৬) সমুদ্র উপকূলে ভূমিরূপের পরিবর্তন:

ভূমিকম্পের ফলে সমুদ্র উপকূলবর্তী ভূমি ওপরে উঠে বা নীচে বসে যায়।
যেমন – ভূতাত্ত্বিক তথ্য অনুসারে ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলের বহু জায়গায় ভূমিকম্পের ফলে উত্থান ও অবনমনের নিদর্শন আছে।

৭) ভূগর্ভস্থ স্বাভাবিক জলনির্গমন প্রণালীর পরিবর্তন:

ভূমিকম্পের ফলে কোথাও নতুন প্রস্রবণ সৃষ্টি হয়, কোথাও পুরোনো প্রস্রবণ এর প্রবাহ স্তব্ধ হয়ে যায় বা প্রবাহ বেড়ে যায়।

৮) জলাভূমি সৃষ্টি:

ভূমিকম্পের ফলে বিস্তীর্ণ এলাকা অবনমিত হয়ে জলাভূমি সৃষ্টি হতে পারে।
যেমন – ১৮১৯ সালে ভূমিকম্পের ফলে গুজরাটের কচ্ছ উপদ্বীপের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল বসে গিয়ে জলাভূমি সৃষ্টি হয়, যার বর্তমান নাম রান অঞ্চল।

৯) ভূগর্ভ থেকে জল ও বালি নির্গমন:

ভূমিকম্পের ফলে অনেক সময় পাললিক শিলাগঠিত অঞ্চলের ভূমিতে গভীর ফাটলের সৃষ্টি হয়। কোনো কোনো জায়গায় ফাটলের মধ্য দিয়ে ভূগর্ভস্থ জল, বালি,কাদা ইত্যাদি নির্গত হয়।
যেমন – ১৯৩৪ সালে বিহারের ভূমিকম্পে গঙ্গা অববাহিকায় এরকম অসংখ্য ফাটল সৃষ্টি হয়ে জল ও বালি নির্গত হয়ে ছিল।

১০) সুনামি সৃষ্টি:

সমুদ্র তলদেশে ভূমিকম্প হলে যে দৈত্যাকার ঢেউ এর সৃষ্টি হয়, তাকে সুনামি বলে।
যেমন – ২০০৪ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারত মহাসাগরের তলে সৃষ্ট প্রবল ভূমিকম্পের প্রভাবে যে সুনামি হয় তার তাণ্ডবে ওই মহাসাগরের উপকূলে সংলগ্ন অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতি হয়।

১১) লোয়েশ সৃষ্টি:

১৯২০ সালে চীনের কানসু অঞ্চলের ভূমিকম্পে যে ব্যাপক লোয়েশ সৃষ্টি হয়ে ছিল, তা নদনদীর গতিপথে জমা হয়ে জলনির্গমন ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল এবং সেইসঙ্গে বহু অঞ্চল লোয়েশ এ ঢাকা পড়ে গিয়েছিল।

১২) জীবনহানি ও সম্পত্তির ধ্বংস:

ভূমিকম্পের ফলে মুহূর্তের মধ্যে গ্রাম,শহর,নগর ধ্বংস স্তূপ এ পরিণত হয়। অগণিত মানুষ ও পশুপাখি মারা যায়,সেতু ভেঙে পড়ে,রাস্তায় ফাটল সৃষ্টি হয়,টেলিফোন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিপুল পরিমাণ ধনসম্পত্তি নষ্ট হয়।

ভিডিও দেখার জন্যে ক্লিক করুন👉

ভূমিকম্পের কারণ ফলাফল ও ভূমিকম্প প্রবন অঞ্চল

আরও পড়ুন / Important links👇

ওয়েগনার এর মহাদেশীয় সঞ্চালন তত্ত্বের সপক্ষে প্রমাণ গুলি বর্ণনা কর।

প্যানজিয়া ও প্যানথালাসা কি? মহিসঞ্চরণ মতবাদের গুরুত্ব আলোচনা কর। About Pangea and Panthalasa in Bengali

ভারতের ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল গুলির নাম লেখো।

ভূমিকম্পের প্রবনতার বিচারে ভারতকে 5 টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। যথা –

১) অঞ্চল -1:

অতি মৃদু ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। জয়পুর, দণ্ডকারণ্য, যোধপুর,তামিলনাড়ু মালভূমি এই অঞ্চলের অন্তর্গত।

২) অঞ্চল-2:

মৃদু ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল। ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা,রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ প্রভৃতি এর অন্তর্গত।

৩) অঞ্চল -3:

মাঝারি ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল। আন্দামান – নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ অংশ,পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল ইত্যাদি এর অন্তর্গত।

৪) অঞ্চল -4:

অধিক ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল। জম্মু ও কাশ্মীর,বিহার,উত্তরাখণ্ড,পশ্চিম হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল, কচ্ছ উপদ্বীপ ইত্যাদি এই অঞ্চলের অন্তর্গত।

৫) অঞ্চল -5:

প্রবল ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল। উত্তর – পূর্ব পার্বত্য অঞ্চল, কচ্ছ উপদ্বীপ ইত্যাদি এই অঞ্চলের অন্তর্গত।

“ভূমিকম্প কাকে বলে? ভূমিকম্পের কারণ ও ফলাফল গুলি আলোচনা করো। Earthquake Causes and it’s effect”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন